بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
আমরা ছোটবেলা থেকেই একটা কথা শুনে বড় হয়েছি- “পরিশ্রমই সৌভাগ্যের প্রসূতি।” দিনরাত এক করে না খেটে পারলে নাকি জীবনে কিছুই হয় না।
কিন্তু একটু থামুন। একটু ভাবুন।
তপ্ত রোদে যে রিকশাচালক ভাই সারাদিন প্যাডেল মারেন, তিনি কি কম পরিশ্রম করেন? যে গার্মেন্টসকর্মী মা ভোরবেলা উঠে রাত অবধি সেলাই করেন, তিনি কি পরিশ্রমে পিছিয়ে? তারপরও কেন তাদের জীবন বদলায় না?
পরিশ্রম দরকার, এটা সত্যি। কিন্তু পরিশ্রমটাই একমাত্র সত্যি নয়।
আমার কোর্সমেট মোল্লা জাহিদ ভাইয়ের কথা বলি। একদিন তিনি আমাকে তার কষ্টের দিনগুলোর কথা বলছিলেন। কোম্পানীর অবস্থা খারাপ তাই হটাৎ তার চাকরিটা চলে যায়। সংসারে অভাব, ছোট বাচ্চা আছে, মাসের শেষে ঘরভাড়া জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। লজ্জা আর অপমানের ভার বুকে নিয়ে তিনি পাঠাও বাইক চালাতে শুরু করলেন। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে – শুধু সংসারটা টিকিয়ে রাখবেন বলে।
সেই দিনগুলোতে রাতে বাসায় ফিরে ক্লান্ত শরীরে ফোন হাতে নিতেন। মাঝে মাঝে ইউটিউবে শায়খ আহমাদুল্লার বয়ান ছেড়ে শুনতেন। একদিন শায়খ বললেন – ভাগ্য ফেরাতে চাইলে আল্লাহর শোকরিয়া আদায় জরুরী। যা আছে তার জন্য কৃতজ্ঞ হও। তাওয়াক্কুল করো; আল্লাহর উপর ভরসা রাখো – তিনি যখন দেন, কেউ আটকাতে পারে না। কথা তার মনে গেথে গেল তাই; জাহিদ ভাই সেই রাত থেকে আমল শুরু করলেন। ফজরের পরে বসে থাকতেন ও অন্যান্য আমল করতেন। মনে মনে ভাবতেন – আজকে আল্লাহ আমাকে কী কী দিয়েছেন। চাকরি নেই, কিন্তু শরীর তো সুস্থ আছে। বাইক আছে, পরিবার পাশে আছে। একটু একটু করে মনের ভেতর থেকে অভিযোগের জায়গায় শুকরিয়া আসতে লাগল।
একদিন সকালের ঘটনায় তিনি অবাক। এক ভাই তার বাইকে উঠলেন। যাত্রা পথে কথা চলতে লাগল। এক পর্যায়ে আরোহী ব্যাক্তি বললেন, “আপনি কি ডেভেলপারের ব্যবসা করতে পারবেন?” জাহিদ ভাই শুনে অবাক। বলেন কি? “কীভাবে? আমি তো এর আগাগোড়া কিছুই জানি না। তাছাড়া এ ধরনের ব্যবসার জন্য শুনেছি প্রচুর টাকার লাগে ” আরোহী ব্যাক্তি বললেন, “আমি আপনাকে গাইড করব।”
শুধু একটা রাইডে পরিচয়। শুধু কয়েক মিনিটের কথা। কিন্তু সেই মুহূর্তটাই জাহিদ ভাইয়ের জীবন বদলে দিল। প্রথমে একটি প্রজেক্ট, তারপর দুটি, তারপর আরও। আজ মোল্লা জাহিদ ভাই আজ কোটি টাকার মালিক। নিজে ব্যবসা করেন, অনেককে কাজ দেন।
জিজ্ঞেস করলাম “ভাই, আপনার সাফল্যের পেছনে গোপন কী আছে?”
তিনি একটুও না ভেবে বললেন, “শোকরিয়া। যখন কিছুই ছিল না, তখনও আল্লাহর শুকরিয়া করতাম। আর আল্লাহ সেই শুকরিয়ার বরকতেই রাস্তা বের করে দিয়েছেন।”
لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ ۖ وَلَئِن كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ
মহান আল্লাহ তায়ালা কুরআনে কারীমে বলেছেন- “যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের নেয়ামত বাড়িয়ে দেব।“ – সূরা ইবরাহীম: ৭
লক্ষ্য করুন – আল্লাহ তায়ালা বলেননি “বেশি পরিশ্রম করলে বাড়িয়ে দেব।” বরং বললেন – “শোকর করলে বাড়িয়ে দেব।”
চৌদ্দশো বছর আগের এই কথাটা আজকের বিজ্ঞান এখন ল্যাবরেটরিতে প্রমাণ করছে। আধুনিক নিউরোসায়েন্স বলছে, মানুষ যখন মন থেকে কৃতজ্ঞতা অনুভব করে, তখন মস্তিষ্কে Dopamine আর Serotonin নামের দুটো হরমোন বের হয়। এগুলো শুধু মনকে ভালো রাখে না – পাশাপাশি মস্তিষ্কের যে অংশ সিদ্ধান্ত নেয়, পরিকল্পনা করে, সুযোগ চেনে – সেই Prefrontal Cortex-কে জাগিয়ে তোলে।
মনোবিজ্ঞানী ড. বারবারা ফ্রেডরিকসনের “Broaden and Build” গবেষণা বলছে – যে মানুষের মন কৃতজ্ঞতায় ভর্তি থাকে, সে চারপাশে সুযোগগুলো দেখতে পায়। যে মানুষ সবসময় অভাবের কথা ভাবে, সে সেই সুযোগের পাশ দিয়ে হেঁটে যায়, কিন্তু তা চোখে পড়ে না।
জাহিদ ভাইয়ের সেই পাঠাওয়ের রাইডটার কথা মনে করুন। সেই মানুষটা হয়তো আরও হাজারজন রাইডারের বাইকেও উঠেছেন। কিন্তু কথাটা শুধু জাহিদ ভাইকেই বলেছিলেন – কারণ তার চোখে, তার কথায়, তার আচরণে একটা আলাদা প্রশান্তি ছিল। কৃতজ্ঞ মানুষের মুখে একটা নূর থাকে, যা অন্য মানুষকে আকৃষ্ট করে। আর সেই আকর্ষণ থেকেই সুযোগ তৈরি হয়।
Harvard-এর গবেষণায় আরও দেখা গেছে – কৃতজ্ঞ মানুষ তাৎক্ষণিক হতাশায় ভেঙে পড়ে না। দীর্ঘমেয়াদে ভাবতে পারে। ধৈর্য ধরতে পারে; আর এই একটা গুণই একজন মানুষকে সত্যিকারের সফল বানায়।
পরিশ্রম হলো গাড়ি আর কৃতজ্ঞতা হলো জ্বালানি। জ্বালানি ছাড়া গাড়ি যেমন চলে না, শোকরিয়া ছাড়া পরিশ্রমও মানুষকে সামনে নিয়ে যেতে পারে না। জাহিদ ভাই আজ যেখানে আছেন, শুধু পরিশ্রম করে সেখানে পৌঁছাননি – পৌঁছেছেন কারণ সবচেয়ে অন্ধকার সময়েও তিনি আল্লাহর দিকে মুখ তুলে বলেছিলেন, আলহামদুলিল্লাহ।
তাই আজ থেকে একটাই কাজ করুন। ঘুমানোর আগে, অথবা ফজরের পরে, এক মিনিট চোখ বন্ধ করুন। ভাবুন – আজকে আল্লাহ আমাকে কী দিয়েছেন। তারপর মন থেকে বলুন – আলহামদুলিল্লাহ।
একটি কৃতজ্ঞ হৃদয় কখনো দরিদ্র হতে পারে না।
এই লেখাটা যদি আপনার বুকে একটুও নাড়া দিয়ে থাকে, তাহলে এখনই আপনার কাছের একজনকে শেয়ার করুন। হয়তো এই মুহূর্তে আপনার কোনো বন্ধু, ভাই বা পরিচিত কেউ জাহিদ ভাইয়ের মতো কঠিন সময়ের মধ্যে আছেন। একটা শেয়ারই হয়তো তার জীবনে নতুন আলো জ্বালিয়ে দিতে পারে।
কমেন্টে লিখুন – আজকে আপনি কোন নেয়ামতের জন্য আলহামদুলিল্লাহ বলবেন?
কিতাবুল বারাকাহ ওয়েবসাইটে ভিজিট করুন, ইসলামিক বই সংগ্রহ করুন এবং জীবনকে পরিবর্তন করুন।