যে প্রতিদান শত্রুকেও বন্ধু বানিয়েছিল
আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, একজন মানুষকে ভয় দেখিয়ে তার আনুগত্য পাওয়া যায়, কিন্তু তার হৃদয় জয় করা যায় না কেন?
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিজয়ীরা তরবারি দিয়ে নয়, বরং প্রতিদান দিয়ে যুগে যুগে মানুষের মন জয় করেছিলেন।
কারন মানুষের মন এক অদ্ভুত রাজ্য। যেখানে জোর করে বা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সাময়িক আনুগত্য পাওয়া গেলেও, স্থায়ীভাবে সাম্রাজ্য বিস্তার করা যায় না। মানব হৃদয়ে স্থায়ীভাবে প্রভাব বিস্তারের সবচেয়ে বড়, অথচ নীরব হাতিয়ার হলো ‘প্রতিদান’। প্রতিদান কেবলই কোনো কাজের জাগতিক লেনদেন বা পারিশ্রমিক নয়; এটি ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা এবং সহমর্মিতার এমন এক মেলবন্ধন, যা যেকোনো কঠিন মনকেও মোমের মত গলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। যখন আপনি কাউকে তার ভালো কাজের বা আচরণের উত্তম প্রতিদান দেবেন, তখন আপনি আসলে তার হৃদয়ের চাবিটি আপনার নিজের হাতে তুলে নেবেন।
কারন মানুষ স্বভাবগতভাবেই প্রতিদানের প্রতি দুর্বল। এজন্য বিজ্ঞান ও ধর্ম উভয়ই এর পেছনের মনস্তত্ত্বকে জোরালোভাবে সমর্থন করে থাকে। মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন, “উত্তম কাজের প্রতিদান উত্তম পুরস্কার ছাড়া আর কী হতে পারে?” (সূরা আর-রহমান: ৬০)। আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “যে মানুষের কৃতজ্ঞতা আদায় করে না, সে আল্লাহরও কৃতজ্ঞতা আদায় করে না।” (হাদীস শরীফ, সুনান আত-তিরমিজি, হাদিস: ১৯৫৪) অন্যদিকে, আধুনিক মনস্তত্ত্বে একে “Principle of Reciprocity” বলা হয়। উদাহরণ সরূপ ওলামায়ে কেরাম বলেন, মানুষের রিজিকের মধ্যেই ভালোবাসা ও সম্পর্ক গড়ে তোলার এক বিশেষ শক্তি নিহিত থাকে।। তাই মানুষকে খাওয়ালে তার মধ্যো মেহমানদারী করা ব্যাক্তির প্রতি তার মনের অজান্তেই মোহাব্বত তৈরি হতে থাকে। রবার্ট চিয়ালদিনি চমৎকারভাবে তাঁর বিখ্যাত ‘ইনফ্লুয়েন্স’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন, যখন কেউ তাকে প্রথমে কিছু দেয়, মানুষ স্বভাবগতভাবেই সে সেই ব্যক্তির প্রতি ঋণী বোধ করে। নিউরোসায়েন্স বলে, প্রতিদান বা উপহার পেলে মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ ও ‘অক্সিটোসিন’ হরমোন নিঃসৃত হয়, যা অপর ব্যক্তির প্রতি গভীর বিশ্বাস ও স্থায়ী ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করে।
কাবাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে কুরাইশের নেতারা। কারও মাথা নিচু, কারও চোখে আতঙ্ক। আজ থেকে কয়েক বছর আগেও তারাই মুহাম্মদ (সা:)-কে মক্কার রাস্তায় অপমান করেছিল। আজ ভাগ্যের চাকা ঘুরেছে। তারা বন্দি, আর মুহাম্মদ (সা:) বিজয়ী সেনাপতি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন, আর অন্যদিকে কুরাইশ নেতারা—যারা বিগত কুড়ি বছর ধরে তাঁর ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছিল, তাঁকে মক্কা থেকে তাড়িয়েছিল এবং তাঁর সাহাবিদের হত্যা করেছিল।
আজ কুরাইশরা সম্পূর্ণ পরাস্ত, তাদের বাঁচার কোনো উপায় নেই। আরবের নিয়ম অনুযায়ী আজ তাদের কঠিন শাস্তি বা দাসত্বের মুখোমুখি হওয়ার কথা। তারা ভয়ে কাঁপছিল এবং ভাবছিল আজ হয়তো তাদের রক্তের নদী বইবে। ক্ষমতার এই চরম দ্বন্দ্বে তরবারির আঘাতের চেয়েও বড় মানসিক সংকট তৈরি হয়েছিল—শত্রুদের মন কি কোনোদিন জয় করা সম্ভব?
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘটল ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা। সবাই যখন প্রতিশোধের ঘোষণা শোনার অপেক্ষায়, তখন আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের সামনে দাঁড়িয়ে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন এবং ভালোবাসার এক অনন্য ‘প্রতিদান’ তুলে দিলেন। যে হাতগুলো অতীতে পাথর ছুড়েছিল, সেই হাতগুলোতে তিনি পরম শ্রদ্ধা ও নিরাপত্তার প্রতিদান দিলেন। ফলাফল? তরবারি যা করতে পারেনি, এই নিঃস্বার্থ প্রতিদানের প্রভাব তা করে দেখাল—চিরশত্রুরা এক নিমেষে ইসলামের সবচেয়ে একনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হলো।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও অধীনস্থ কর্মচারী বা পরিবারের সদস্যদের ত্যাগের পর একটি ছোট্ট ‘ধন্যবাদ’ বা কাজের সদয় মূল্যায়ন ঠিক একইভাবে সব মানসিক দ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়ে সম্পর্কের শ্রেষ্ঠ সমাধান এনে দেয়।
তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, প্রতিদান কোনো দুর্বলতা নয়; এটি হলো নেতৃত্ব এবং মানুষের অবচেতন মনে স্থায়ীভাবে প্রভাব বিস্তারের এক অমোঘ ও বিস্ময়কর প্রভাব। ক্ষমতার প্রভাব একদিন শেষ হয়ে যায়, কিন্তু ভালোবাসার প্রতিদান মানুষের মনে যে প্রভাব রেখে যায়, তা হ্রদয়ে অনন্তকালের জন্য দাগ রেখে যায়। হয়তো আপনার একটি আন্তরিক ধন্যবাদ, একটি ছোট উপহার, কিংবা কারও প্রতি প্রকাশ করা কৃতজ্ঞতাই এমন একটি হৃদয় জয় করবে, যা বছরের পর বছর কোনো যুক্তি বা ক্ষমতা দিয়ে জয় করা সম্ভব হয়নি। কারণ মানুষ কথা ভুলে যায়, কিন্তু ভালোবাসার প্রতিদান খুব কমই ভুলে যায়। আর এ কারণেই প্রতিদান শুধু একটি আচরণ নয়, মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী প্রভাব বিস্তারের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার।
ইসলামী বইয়ের প্রয়োজনে কিতাবুল বারাকাহ ওয়েবসাইটে ভিজিট করুন।